হাতিয়া দ্বীপ

মেঘনার মোহনার চরভূমি — ভূতাত্ত্বিক হিসেবে তরুণ, নদীর হাতে প্রতিনিয়ত নতুন করে গড়া, আর পাঁচ লক্ষাধিক মানুষের বাসস্থান।

সন্ধ্যায় হাতিয়া দ্বীপের নদীতীর

ছবি: Aftab Hossain · CC BY-SA 4.0

কোথায় এই দ্বীপ

হাতিয়া উপজেলা চট্টগ্রাম বিভাগের নোয়াখালী জেলায়, আনুমানিক ২২°২২′ উত্তর ও ৯১°০৭′ পূর্বে অবস্থিত। এটি একক কোনো দ্বীপ নয়, বরং একটি দ্বীপপুঞ্জ — হাতিয়া দ্বীপ, নিঝুম দ্বীপ, দমার চর, ভাসান চর ও স্বর্ণদ্বীপসহ আরও কয়েকটি চর নিয়ে গঠিত। উপজেলার আয়তন প্রায় ১,৫০৭ বর্গকিলোমিটার, যার মধ্যে হাতিয়া দ্বীপের আয়তন প্রায় ৪৮০ বর্গকিলোমিটার।

গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের মিলিত স্রোত বয়ে আনা মেঘনা ঠিক এখানেই চওড়া হয়ে উত্তর বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। উত্তরে সুবর্ণচর ও রামগতি, পশ্চিমে মনপুরা, আর পূর্ব ও দক্ষিণে খোলা সমুদ্র।

মানুষ ও জীবিকা

২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী উপজেলার জনসংখ্যা ৫,৩৭,৩৬৬ জন, পরিবারের সংখ্যা ১,১২,০৩২, আর জনঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ৩৫৬ জন। মোট জনসংখ্যার এক-পঞ্চমাংশের কিছু বেশি শহরাঞ্চলে বাস করে। সাত বছর ও তদূর্ধ্বদের সাক্ষরতার হার ৬৪.৪ শতাংশ, নারী-পুরুষে যা প্রায় সমান।

কৃষি ও মৎস্যজীবিতাই দ্বীপের অর্থনীতির মূল ভিত্তি। জমি থেকে আসে ধান, নারকেল, সুপারি ও কলা; আর নদী থেকে ইলিশ। উপজেলায় ৫২টি হাটবাজার রয়েছে, এবং উচ্চশিক্ষার প্রধান প্রতিষ্ঠান হাতিয়া দ্বীপ সরকারি কলেজ।

যে নদী বারবার মানচিত্র বদলে দেয়

হাতিয়া স্থির কোনো ভূখণ্ড নয়। দ্বীপটি নিয়ে করা গবেষণা বলছে, প্রতি ১৩৮ থেকে ১৪০ বছরে এখানে প্রায় এক মাইল নতুন ভূমি জেগে ওঠে — সেই হিসাবে দ্বীপটির বয়স পাঁচ থেকে ছয় হাজার বছর। ১৮৯০ সালের পর থেকে উত্তর তীরে ভাঙন তীব্র হয়, আবার একই সময়ে উত্তর দিকে ভাঙনের চেয়ে দুই থেকে পাঁচ গুণ বেশি হারে নতুন চর জেগেছে।

এর ফল হলো — পরিবারগুলোকে সরে যেতে হয়। বসতভিটা গড়ে ওঠে আরও ভেতরের দিকে, আর মাঝের চ্যানেল চওড়া হতে হতে হাতিয়া ও সন্দ্বীপের দূরত্ব ষাট মাইল ছাড়িয়েছে। দ্বীপে বছরে গড়ে প্রায় ৩,৩৩২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়, আর বঙ্গোপসাগরের ঘূর্ণিঝড়ের পথ ঠিক এর ওপর দিয়েই।

হাতিয়া ছাত্র ফোরামের অনেক কাজের পেছনের প্রেক্ষাপট এটিই: যে শিক্ষার্থীর পরিবার দুবার ভিটেমাটি হারিয়েছে, তার সহানুভূতি নয়, শিক্ষাবৃত্তি দরকার।

সংস্কৃতি

হাতিয়ায় রয়েছে মধ্যযুগীয় ইসলামি ঐতিহ্য, যার মধ্যে নবম শতকের একটি মসজিদও আছে — আর আছে নিজস্ব দ্বীপ-সংস্কৃতি। ভাটিয়ালি আর জারিগান এখনও গাওয়া হয় এখানে, এবং বছরের ছন্দ চলে মূল ভূখণ্ডের পঞ্জিকা নয়, বরং জোয়ার-ভাটা, ইলিশের মৌসুম আর বর্ষার হিসাবে।

দর্শনীয় স্থান

দ্বীপে কোথায় যাবেন, আর কখন।

  • নিঝুম দ্বীপ

    নিঝুম দ্বীপ

    পঞ্চাশের দশকের গোড়ায় বঙ্গোপসাগরের মোহনায় পলি জমে জেগে ওঠা এই দ্বীপপুঞ্জের মোট আয়তন প্রায় ১৬৩ বর্গকিলোমিটার, যার ৩৯ বর্গকিলোমিটার স্থলভাগ। বন বিভাগের ১৯৭৪ সাল থেকে শুরু হওয়া বনায়নের ফলে আজ এখানে গড়ে উঠেছে ঘন কেওড়া বন, আর তাতে বিচরণ করে প্রায় পাঁচ হাজার চিত্রা হরিণ। ভোরে বা পড়ন্ত বিকেলে বনের ভেতর হেঁটে গেলে হরিণের দল চোখে পড়ে প্রায় নিশ্চিতভাবেই।

    যাওয়ার সেরা সময়: নভেম্বর – ফেব্রুয়ারি (শীতকাল)

    ছবি: Md Saiful Islam Khan (Aopu) · CC BY-SA 4.0

  • নিঝুম দ্বীপ জাতীয় উদ্যান

    নিঝুম দ্বীপ জাতীয় উদ্যান

    ২০০১ সালের ৮ এপ্রিল সরকার এই দ্বীপের প্রায় ৪০,৩৯০ একর এলাকাকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করে; ২০১৯ সালে আশপাশের সমুদ্রসীমাকে সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করা হয়। কেওড়া গাছ এখানকার প্রধান প্রজাতি — এর শিকড় বালুমাটি ধরে রাখে এবং ঝড়ের সময় দ্বীপকে আড়াল দেয়। শীতে হাজার হাজার পরিযায়ী পাখি এখানে এসে জড়ো হয়।

    যাওয়ার সেরা সময়: ডিসেম্বর – জানুয়ারি, পাখি দেখার সেরা সময়

    ছবি: Arman333 · CC BY-SA 3.0

  • নামার বাজার সমুদ্রসৈকত

    নামার বাজার সমুদ্রসৈকত

    নিঝুম দ্বীপের সবচেয়ে পরিচিত সৈকত, আর দ্বীপে সূর্যাস্ত দেখার সবচেয়ে জনপ্রিয় জায়গা। সৈকতের ওপর কাঠের সেতু আর মাঝখানের ছাউনিতে বসে বিকেলের আলো নিভে যাওয়া দেখেন পর্যটকেরা। থাকার জন্য কয়েকটি রিসোর্ট সৈকতের পাশেই।

    যাওয়ার সেরা সময়: নভেম্বর – মার্চ, বিকেল ৪টার পর

    ছবি: Sromei · CC BY-SA 4.0

  • চেয়ারম্যান ঘাট

    চেয়ারম্যান ঘাট

    নোয়াখালীর মূল ভূখণ্ড থেকে হাতিয়ায় ঢোকার প্রধান দরজা। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ট্রলার আর সি-ট্রাক ছাড়ে এখান থেকে, আর ঘাটজুড়ে চলে ইলিশ ওঠানামার ব্যস্ততা। মেঘনার মোহনায় ঘাট থেকে ছেড়ে আসা নৌকার সারি হাতিয়ার সবচেয়ে চেনা দৃশ্যগুলোর একটি।

    যাওয়ার সেরা সময়: সারা বছর; সকালের ট্রিপ সবচেয়ে সুবিধাজনক

    ছবি: Salim Khandoker · CC BY-SA 4.0

  • তমরুদ্দিন সৈকত

    তমরুদ্দিন সৈকত

    হাতিয়া দ্বীপের পশ্চিম দিকে তমরুদ্দিন ঘাটের কাছের এই সৈকতে ভিড় কম, তাই মেঘনার মোহনা আর খোলা আকাশ একসঙ্গে দেখার জন্য জায়গাটি চমৎকার। জোয়ার-ভাটার সঙ্গে সৈকতের চেহারা বদলায়, তাই যাওয়ার আগে স্থানীয়দের কাছ থেকে জোয়ারের সময় জেনে নেওয়া ভালো।

    যাওয়ার সেরা সময়: অক্টোবর – মার্চ, ভাটার সময়

    ছবি: Mijanur Rahman Sowrov · CC BY-SA 4.0

  • দমার চর / চর ওসমান

    দমার চর / চর ওসমান

    হাতিয়া দ্বীপপুঞ্জের একেবারে বাইরের দিকের চর। এর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ম্যানগ্রোভ বন, বাকিটা খোলা সবুজ তৃণভূমি, যেখানে হাতিয়া ও নিঝুম দ্বীপের বাসিন্দাদের মহিষ ও গরুর পাল অবাধে চরে বেড়ায়। এখানে কোনো স্থায়ী বসতি নেই — যাওয়ার জন্য স্থানীয় গাইড ও ভালো আবহাওয়া দুটোই দরকার।

    যাওয়ার সেরা সময়: ডিসেম্বর – ফেব্রুয়ারি, স্থানীয় গাইডসহ

    ছবি: Emonkhan · CC BY-SA 4.0

  • ম্যানগ্রোভ বন ও খাল

    ম্যানগ্রোভ বন ও খাল

    নিঝুম দ্বীপের ভেতর দিয়ে চলে গেছে চৌধুরী খালসহ অসংখ্য ছোট খাল, দুই পাশে কেওড়ার সারি। ছোট নৌকায় ভাটার সময় খাল ধরে ঢুকলে বক, মাছরাঙা আর শীতের পরিযায়ী পাখি খুব কাছ থেকে দেখা যায়। বনটি একই সঙ্গে ঘূর্ণিঝড়ের সময় দ্বীপের প্রাকৃতিক বর্ম।

    যাওয়ার সেরা সময়: নভেম্বর – ফেব্রুয়ারি, ভোরবেলা

    ছবি: Moshiurshimul · CC BY-SA 4.0

  • কমলার দিঘি

    কমলার দিঘি

    হাতিয়ার পুরোনো জনপদের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি বড় দিঘি, স্থানীয় লোককাহিনিতে যার নাম বারবার ফিরে আসে। চারপাশে নারকেল আর সুপারিগাছের সারি, আর বিকেলে দিঘির পাড় হয়ে ওঠে আশপাশের গ্রামের আড্ডার জায়গা।

    যাওয়ার সেরা সময়: সারা বছর, বিশেষত বিকেলে

    ছবি: Majed uddin · CC BY-SA 4.0

এই পাতার সব ছবি উন্মুক্ত লাইসেন্সের অধীনে, এবং প্রতিটির নিচে আলোকচিত্রীর নাম উল্লেখ করা আছে।